গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ উপলক্ষে ফেনীতে মানববন্ধন ও সমাবেশে করেছে অধিকার।
শনিবার দুপুরে অধিকার ফেনী ইউনিটের আয়োজনে ফেনী প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনেরর মা রওশন আরা বেগম।
ফেনীর প্রবীণ সাংবাদিক আনন্দ তারকা পত্রিকার সম্পাদক মামুনুর রশিদের সভাপতিত্বে মুলপ্রবন্ধ পাঠ করেন মানবাধিকার সংগঠক ‘২৪ এর আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ জুলাইযোদ্ধা মো. আবুল হাসান শাহীন।
অধিকার ফেনীর ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সাপ্তাহিক স্বদেশপত্র সম্পাদক এন এন জীবন, দৈনিক ফেনী’র সম্পাদক আরিফুল আমিন রিজভী, দৈনিক সময় রেখার সম্পাদক লায়ন জাফর উল্যাহ, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক লায়ন মোর্শেদ হোসেন।
বক্তব্য রাখেন মানবাধিকার দৈনিক দেশ রুপান্তরের ফেনী জেলা প্রতিনিধি শফিউল্লাহ রিপন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রচার সম্পাদক হাবিব মিয়াজী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ফেনী জেলার যুগ্ন সদস্য সচিব মুহাইমিন তাজিম, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী নসু, পার্স্ট প্রেসিডেন্ট ফোরাম ফেনী লিও ফ্যামিলির সভাপতি জাফর আহমদ ভূঞা।
সমাবেশে গুমের শিকার হওয়া যুবদল নেতা মাবুবুর রহমান রিপনের চাচা ওহিদুর রহমান, মাসিক মৌলিক পত্রিকার সম্পাদক নুরুল আফসার, নজরুল একাডেমী ফেনী জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মোস্তফা কামাল বুলবুল, সাংবাদিক ইউনিয়ন ফেনী’র সাবেক দপ্তর সম্পাদক এম ডি মোশারফ, অধিকার ডিফেন্ডার আমিনুল ইসলাম শাহীন, মো. শহিদুল ইসলাম মিশু সহ সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সমাবেশ শেষে ফেনী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে মানবাধিকার কর্মীরা।
গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনেরর মা রওশন আরা বেগম বলেন, “গত ১১ বছর আগে আমার ছেলে গুম হয়েছে। যুবদলের নেতা হওয়া রাতের আঁধারে আমার ছেলেকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায় একটি র্যাব পরিচয়ে সদস্যরা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ছেলে গুমের সন্ধান বা বিচার পাইনি। বিদায়ী অন্তবর্তীকালীন সরকারের গুম অধ্যাদেশ তৈরি করায় অনেক আশা নিয়ে বুক বেধে ছিলাম বর্তমান সরকার আমার ছেলের গুমের বিচার করবে। কিন্তু বর্তমান সরকার গুম অধ্যাদেশ কার্যকর না করায় ছেলের বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কাবোধ করছি। বিএনপি করার কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়া ছেলের গুমের বিচার যদি বিএনপির সরকার না করে তাহলে আমি বিচার কার কাছে চাইবো?’
অধিকার তাঁর লিখিত বক্তব্যে জানায়, প্রতি বছর মে মাসের শেষ সপ্তাহে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে এবং গুমের সাথে জড়িত ব্যাক্তিদের বিচারের দাবীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ পালন করা হয়। ১৯৮১ সালে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গড়ে ওঠা দক্ষিণ আমেরিকার একটি সংগঠন ফেডেফেম’ প্রথম এই গুমের বিরুদ্ধে সপ্তাহটি পালন করা শুরু করে। এরপর থেকেই গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সপ্তাহটি পালন করে আসছে। ৬০ এর দশকে ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অধীনে অনেকেই গুম হয়েছিলেন। তখন সপ্তাহটি পালন করার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল গুমের বিরুদ্ধে প্রচারকে শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করেছে। পতিত হাসিনা সরকারের শাসনামলে সারা দেশে বেআইনীভাবে আটক রাখার বন্দিশালা তৈরি করা হয়। এই সব অবৈধ গোপন বন্দিশালায় বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং তথাকথিত “জঙ্গিদের” আটক করে রাখা হতো। এরমধ্যে আলোচিত গোপন বন্দিশালা হলো ডিজিএফআই এর জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেন্টার এবং র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেন্টার। এই বন্দিশালাগুলোতে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে মূলত যাঁরা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হতেন গুম করে নির্যাতন করা হতো। এছাড়াও অনেককে আটকের পর ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে নির্যাতনের পর সন্ত্রাস বিরোধী মামলাসহ বিভিন্ন মিথ্যা বানোয়াট মামলায় আসামি করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের পতন হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৪ সালের ২৯ অগাস্ট গুম হতে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বাংলাদেশ অনুমোদন করে। এই সনদ গ্রহণ করার আগে গুমসংক্রান্ত বিষয়ে বিচার করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। কিন্তু এই সনদ অনুমোদনের ফলে গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন তৈরির বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ অনুমোদন দেয়।
কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংসদে পাশ করেনি। ফলে অধ্যাদেশটি বাতিল হিসেবে গণ্য হয়। অথচ রাজনৈতিক দল হিসেবে হাসিনা সরকার কর্তৃক সবচেয়ে বেশি গুমের ভিকটিম হয়েছিলেন বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা। গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা দুইজনসহ ফিরে না আসা একজন ভিকটিমের স্ত্রী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। আজ অবধি ফেরত না আসা ভিক্টিমদের পরিবার সরকার প্রতিশ্রুত সার্টিফিকেট না পাওয়ায় তাঁরা ভিক্টিমের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার ও হস্তান্তরের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিবারগুলো এখনও তাঁদের প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। ফেরত আসা অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন।
অধিকার মনে করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ টি আইনে পরিণত না করা ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সীমাহীন অন্যায় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি ফিরে আসেননি তাঁদের পরিবারের সদস্যরা আজ চরম অনিশ্চয়তায় জীবন পার করছেন।
অধিকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরে পাওয়াসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। গুমরে বিরুদ্ধে অধিকার এর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারবাহিকতার অংশ হিসেবে আজকের এই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
সরকারের কাছে অধিকার এর দাবি জানাচ্ছে-
১. অবিলম্বে গুম প্রতিরোধ আইন জাতীয় সংসদে পাশ করতে হবে।
২. যে সমস্ত গুমের শিকার ব্যক্তির এখনও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. গুমের পর কিছু ব্যক্তিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতের কারাগারে বন্দি থাকার পর ফিরে এসেছেন। তাই ভারতের কারাগারে বাংলাদেশী আরো গুমের শিকার ব্যক্তি আছেন কি-না সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপন করে তা জানতে হবে।
৪. যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাঁদেরকে অবিলম্বে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে।
৫. গুমের সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোন রকম দায়মুক্তি দেয়া চলবে না।

