দৈনিক “প্রতিদিনের কাগজ”র সম্পাদনায় জটিলতা, প্রকাশনা বন্ধে হাইকোর্টের রুল

 

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে প্রকাশিত দৈনিক ‘প্রতিদিনের কাগজ’ পত্রিকাটির প্রকাশনা কেন বন্ধ করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।

হাইকোর্টের এই নির্দেশনার পর পত্রিকাটির মালিকানা, সম্পাদনা এবং প্রকাশনা সংক্রান্ত বৈধতা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ পাঠকমহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিদিনের কাগজ, তুমি আসলে কার।

অভিযোগ উঠেছে, পত্রিকাটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে মালিকানা ও সম্পাদনা নিয়ে এক ধরনের অস্বচ্ছতা এবং দ্বৈত অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেকে এটিকে এক ছেলের দুই বাবা পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ত্রিশাল এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য এবি এম আনিসুজ্জামানকে প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খায়রুল আলম রফিক। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার পর নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে তিনি নতুন করে রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রমতে, কথিত ৩৬শে জুলাই’-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পর ক্ষমতার বলয়ে টিকে থাকতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার চেষ্টা করেন খায়রুল। তবে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে তাকে বিএনপির বিভিন্ন নেতার দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

এদিকে গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। সম্প্রতি আদালতের এই আদেশের অনুলিপি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি গণমাধ্যম ও সাংবাদিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘প্রতিদিনের কাগজ’ পত্রিকাটির সরকারি ডিক্লেয়ারেশনে সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে মাহমুদুল হাসান রতন-এর নাম নিবন্ধিত রয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকার প্রিন্টার্স লাইনে (শেষ পাতায় প্রকাশিত মুদ্রণ সংক্রান্ত তথ্যে) সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে ইয়াসমিন শীলা এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে খায়রুল আলম রফিক-এর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিক্লেয়ারেশনে নিবন্ধিত ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য কারও নাম সম্পাদক বা প্রকাশক হিসেবে প্রকাশ করা ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন, ১৯৭৩ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং আইনগতভাবে প্রতারণার শামিল বলেও মনে করছেন তারা।

মূলত এই জালিয়াতি ও অস্পষ্টতার কারণেই পত্রিকাটির প্রকৃত মালিকানা এবং পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। ফলে গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা ও আইনি কাঠামোর প্রতি সম্মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’ পত্রিকার সাবেক সহ-সম্পাদক এবং দৈনিক প্রলয় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের (নম্বর: ১৮২৫১/২০২৫) প্রেক্ষিতে আদালত এই রুল জারি করেন। শুনানি শেষে আদালত ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী কেন পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করা হবে না তা জানতে চেয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন।

রিটে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (DFP) মহাপরিচালক, ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (DC), জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পত্রিকাটির বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খায়রুল আলম রফিক-কে বিবাদী করা হয়েছে।

আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সাকিব মাবুদ। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খান জিয়াউর রহমান, মোহাম্মদ আব্দুল করিমসহ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছেন, রুলের নোটিশ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোর্টের মাধ্যমে এবং রেজিস্টার্ড ডাকযোগে দ্রুত বিবাদীদের ঠিকানায় পাঠাতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পত্রিকাটির মালিকানা ও বৈধতা নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

এ বিষয়ে রিট আবেদনকারী শহীদুল ইসলাম বলেন, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের অবৈধ প্রকাশনা এবং প্রতারণার প্রতিকার চেয়ে আমি মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেছি। ২০২২ সালে আমি এবং আমার বর্তমান প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদক লায়ন মোঃ মির্জা সোবেদ আলী পত্রিকার ডেকোরেশন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য খায়রুল আলম রফিককে মোটা অংকের অর্থ প্রদান করি। এর পর আমাকে সহ-সম্পাদক এবং মির্জা সোবেদ আলীকে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, পত্রিকাটি মূলত ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত একটি আঞ্চলিক প্রকাশনা এবং খায়রুল আলম রফিক এর প্রকৃত মালিক নন। বিষয়টি জানার পর আমরা আমাদের প্রদত্ত অর্থ ফেরত চাইলে তিনি টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে আমাদের সম্মানহানি করার চেষ্টা করেন।

তিনি দাবি করেন, প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি আইনের আশ্রয় নেন। তার দায়ের করা রিটের প্রেক্ষিতেই হাইকোর্ট পত্রিকাটির অবৈধ প্রকাশনা কেন বন্ধ করা হবে না তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করেছেন।

শহীদুল ইসলামের ভাষায় তিনি বলেন,আ মি বিশ্বাস করি আদালতের এই নির্দেশনার মাধ্যমে প্রতারক খায়রুল আলম রফিকের প্রকৃত মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং অবৈধভাবে পরিচালিত এই পত্রিকার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

Related Articles

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles