বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখে’র সমাধিস্থলে জাদুঘর নির্মাণের দাবি

যশোর জেলা শহর হতে সোজা পশ্চিমে ৩০ কিলোমিটার মত দূরত্ব বাংলাদেশের সিমান্তবর্তী একটি গ্রাম কাশিপুর। গ্রামটি শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নে অবস্থিত। গ্রামটি বাঙ্গালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কেননা এখানেই ছয় সহযোদ্ধা সহ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ।

সমাধিস্থলে সংরক্ষিত সংক্ষিপ্ত জীবনী হতে জানা যায়, ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ তৎকালিন ইপিআর (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি) এ যোগদান করেন। তিনি চাকুরিরত অবস্থায় দিনাজপুর সেক্টর থেকে ১৯৭০ সালের ১ জুলাই যশোর সেক্টরে হেড কোয়াটারে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙ্গালিদের উপর নির্যাতন, হত্যা আর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালালে নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে বেড়ে উঠা এই টকবগে যুবক স্থির থাকতে পারলেন না। যশোর ৮ নং সেক্টরের অধিনস্থ ৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নে (ইপিআর এর সাবেক ৪র্থ উইং) বাঙ্গালি সেনাদের নিয়ে গঠিত একটি কোম্পানিতে নৈমিত্তিক ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যোগদান করেন। দিনটা ছিল ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ঝিকরগাছা উপজেলার ছুটিপুর-গোয়ালহাটি পাকহানাদার বাহিনীর ঘাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমণ করেন।

তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে তুমুল লড়াই করছিলেন। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের পাশেই এলএমজি নিয়ে যুদ্ধরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া। তিনি গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন। সাথে সাথে নান্নু মিয়াকে চিকিৎসার জন্য অন্য যোদ্ধাদের তিনি সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। আর নান্নুর অস্ত্র নিজ হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন। তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রু পক্ষের মর্টার শেল এর আঘাতে মারাত্মক ভাবে আহত হন নূর মোহাম্মদ শেখ। এক পর্যায়ে তিনি পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। শত্রু সৈন্যরা নির্যাতন করে তার সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত করে। বেয়নেট দিয়ে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের দুইটি চোখ উপড়ে ফেলে হানাদার বাহিনী। এই শহীদের মরদেহ সহযোদ্ধারা রণাঙ্গন থেকে নিয়ে সিমান্তবর্তী কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করেন।

পরে সিপাহী এনামুল হজ, সিপাহী আব্দুস ছাত্তার, বাহাদুর গেরিলা, এমসিএ সৈয়দ আতর আলী, সুবেদার মনিরুজ্জামান ও আব্দুল আহাদ নামে স্বাধীনতা যুদ্ধে ছয় শহীদকে নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধির পাশে কবর দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর এই বীরযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

স্থানীয় জায়েদা বেগম ও তার পরিবারের সদস্যরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বীরশ্রেষ্ঠের সমাধিস্থলে আমাদের পরিবারের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে দেখভাল করে আসছে। জায়েদা বলেন আমি নিজে গত ৪-৫ বছর ধরে মাজার দেখভাল সহ সপ্তাহে একদিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি। একাজে কোন পারিশ্রমিক পাই না। আমার অসুস্থ স্বামী সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসারেও দেশের স্বাধীনতা ও শহীদ বীরশ্রেষ্ঠসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালবাসা ও শ্রোদ্ধাবোধ থেকে একাজ করে আসছি। তবে কষ্টের বিষয় হচ্ছে মাজার প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত থাকায় স্থানীয় ও বাইরে থেকে আগত দর্শনার্থীরা মাজারে বেড়াতে এসে মাজারকে অসম্মানিতসহ পরিবেশ নষ্ট করছে। এতে কিছু বলতে গেলে আমাকে নানা কথার সম্মুখীন হতে হয়। আবার এখানে কোন স্যানিটারির ব্যবস্থা না থাকায় আগতদের প্রকৃতির ডাকে স্থানীয়দের বাসাবাড়ির দারস্থ হতে হয়।

স্থানীয়দের দাবি, মাজারের সৌন্দর্য রক্ষার্থে সিমানা প্রাচীর নির্মাণ, সর্বসাধারণের জন্য নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, স্যানিটারির ব্যবস্থাসহ সরকারিভাবে দ্রুত নিয়োমিত একজন বেতনভূক্ত সমাধিস্থল দেখভাল ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ করা প্রয়োজন।

স্থানীয় একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন। অথচ স্বাধীন দেশে তারই সমাধিস্থল রয়েছে চরম অবহেলিত। আগামী প্রজন্ম ও সমাধিস্থলে আগত দর্শনার্থীদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বীরশ্রেষ্ঠসহ মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বচিত রণাঙ্গনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে রক্ষনাবেক্ষণ করে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধিস্থলে একটি স্মৃর্তি জাদুঘর গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।

#প্রথম সংবাদ

- Advertisement -

সর্বশেষ সংবাদ