রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২
রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

ছোটগল্পঃ জীবন যুদ্ধ

— মা, মা, আমার আব্বু কোথায়?
— কতদিন না বলছি তোর আব্বু মারা গেছে?
— রিতা তো বলল আমার বাবা মারা যায়নি, এখনো বেঁচে আছে।
— একটা চড় মেরে ঘুরিয়ে ফেলব, আমার কথা তোর কানে যায়না? আজ থেকে তুই আর রিতার সাথে খেলতে যাবিনা। এখন আয়, তোকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।মেয়েটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছি আর ভাবতেছি, কতদিন আর মিথ্যেটাকে লুকিয়ে রাখব মেয়ের কাছে? বড় হলেতো ঠিকই জানতে পারবে। আরেকবার ভাবি, বড় হয়ে জানতে পারলে এতটা কষ্ট নাও পেতে পারে। আমি যে আরো বড় কষ্ট বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছি। মনে পড়লেই যন্ত্রনাটা বাড়ে, এখনো পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল।
.
আমি তখন সবে মাত্র এস. এস. সি পাশ করেছি। তখনো আমার কাছে মনে হত খেলার বয়স শেষ হয়নি। সবাই বলত শিমু এত বড় ঢিঙ্গি মেয়ে হয়েও বাচ্চাদের খেলা ছাড়তে পারেনি।
বাড়ির পাশের ঢালুতে সাতচারা খেলছিলাম, হঠাৎ বান্ধবী এসে বলতেছে, “তোদের বাড়িতে মেহমান আসছে, চাচী তোকে ডাকতেছে।”
বাড়িতে যেতেই মা আমাকে পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকাল। পাশের বাড়ির ভাবি ঘরেই বসা ছিল, আমাকে টেনে নিয়ে সাজানো শুরু করে দিল।
জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে ভাবি? আমাকে সাজাচ্ছ কেন?
উত্তরে বলল, তোকে অনেক বড় ঘর থেকে দেখতে এসেছে। পছন্দ হলে আজই তারা বিয়ের কাজ সেরে ফেলতে চায়।
কিছু বলতে যাব, তখনি আব্বু এসে দেখে গেল আমার সাজানোর কত দূর বাকি।
সাজানো শেষ করে ভাবি আমাকে সাথে করে নিয়ে একটি চেয়ারে মূর্তির মত বসিয়ে রাখল। আর শুরু হল দুই তিনজনের প্রশ্ন, কতদূর পড়ছি, নাম কি? রান্না কি কি পারি ইত্যাদি। একটু পরে আমাকে পাশের রুমে পাঠিয়ে দিল। আধা ঘন্টা পরেই লাল বেনারশী শাড়ী নিয়ে এল আমাকে পড়ানোর জন্য। তার মানে আমাকে পছন্দ হয়ে গেছে, আজই আমার বিয়ে।
মুখ ফোটে কি বলব বা কি বলা উচিত কিছুই মাথায় আসতেছিলনা। সবাই নাকি বেনারশী শাড়ী পড়ার স্বপ্ন দেখে, বধূ সেজে বাপের বাড়ি ছেড়ে শশুড় বাড়ি যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমার স্বপ্ন দেখার আগেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
.
বিয়ের সতেরো দিনের মাথায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমাকে শশুড় বাড়ি পাঠানো হল। আমিও আট দশটা মেয়ের মত বাবা মা ভাবীসহ অনেককে জড়িয়ে ধরে কান্না করে শশুড়বাড়ি রওয়ানা দিলাম।
যাওয়ার পথে মুরব্বীদের একটি বাণী শুনতে হল, “মেয়েরা শশুড়বাড়ি যায় লাল শাড়ী পড়ে বধূ সেজে, আর বের হয় সাদা শাড়ী পড়ে লাশ হয়ে। অর্থ্যাৎ মৃত্যু পর্যন্ত শশুড়বাড়িই আমার ঠিকানা। অনিশ্চিত এক ভেলায় চড়ে নিজের জীবনটাকে সপে দিলাম স্বামী নামের জীবন সাথীর কাছে। যে নাকি সারাটা জীবন সাথী হয়ে থাকবে বলে কথা দিয়েছে।
.
আমার স্বামীর বয়স ঊনত্রিশ, আর আমার ষোল পেরিয়ে সতেরো। ছেলে ভাল, বংশ মর্যাদা ভাল, গ্রাম ছেড়ে শহরে বিয়ে হচ্ছে। এতকিছু দেখে বাবা আর অমত করেনি।
আমিও ভাগ্যকে মেনে নিয়ে স্বামীকে আপ্রাণ ভালবাসার চেষ্টা করে গেলাম। কতটুকু ভালবাসতে পেরেছি জানিনা।
তবে চেষ্টা করেছি, স্বামী আর শশুরবাড়ির মানুষদের মন জয় করে চলার জন্য।
কিন্তু আমি পারিনি মন জয় করতে। আস্তে আস্তে আমি জানতে পারি আমার স্বামী একজন নেশাখোর। এমন কোনদিন বাদ নেই যে সে নেশা করেনা। জানতে পারাটা ততদিনে দেরী হয়ে গিয়েছিল, কারণ তখন আমার পেটে আমার অনাগত সন্তান। বাবা মা খুব করে বলেছিল আমি যেন আমার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাই। তবে আমি আমার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যেতে পারিনি। ভেবেছি হয়তো আমাদের সন্তানের কথা ভেবে হলেও আমার স্বামী নেশা করাটা ছেড়ে দেবে।
.
একটি মেয়ে গর্ভবতী অবস্থায় চায় তার স্বামী সবসময় তার কাছে কাছে থাকুক। তার সুখ-দুঃখ, আর কষ্টের সময়ের ভাগীদার হোক। সেই সময়টাতে আমি আমার স্বামীকে কাছে পাইনি। গভীর রাতে নেশা করে বাড়ি ফিরত, আর আমি সেই রাত অবধি তার পথ চেয়ে বসে থাকতাম। অনেকবার বলেছি আমাদের সন্তান কিছুদিন পর পৃথিবীতে আসবে, আপনি নেশা করা ছেড়ে দিন। বিনিময়ে পেয়েছি চোখ রাঙ্গানো ধমক, এমনকি তেড়ে মারতে আসত।
আমি আর তর্ক করতামনা, আমার এমন অবস্থায় তর্ক করা মানেই একটা বিপদের সম্মুখ্খীন হওয়া।
.
আমাদের একটি মেয়ে সন্তান হয়েছে। আমার মতই সুন্দর, আমার সাথে চেহারারও অনেকটা মিল আছে।
শশুড় বাড়ির লোকজন তেমন একটা খুশি হয়নি, তাতের আশা ছিল তাদের বংশের বাতি জ্বালাতে প্রথমে ছেলে হবে।
তবে আমার মেয়ে হওয়াতে আমি অনেক খুশি। আমার স্বামিও খুশি হতে পারেনি। দিন দিন আরো নেশার পরিমান বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
আমার স্বামি আমার গায়ে প্রথম হাত তুলে আমার মেয়ে হওয়ার সতেরো দিনের মাথায়। আমার মেয়েটি বিছানায় চিৎকার করছিল, আর আমার স্বামি আমাকে মারছিল। আমার অপরাধ আমি কেন বারবার নেশা করা নিয়ে কথা উঠাই।
কিছু বলিনি আমি, আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে একা একা ঘরে বসে কেঁদেছি।
এর পর থেকে প্রায়ই আমাকে মারধোর করত। কখনো দিনের বেলা, কখনো বা গভীর রাতে।
মাসের পর মাস ঝগড়া করে আলাদা বিছানা করে ঘুমিয়েছি, তবুও অশান্তি শেষ হয়নি। কপালে আমার আছে দুঃখ, কোথা থেকে আসবে সুখ?
অবশেষে আর সহ্য করতে পারিনি। মনের মধ্যে জিদ চেপে ধরেছি, জীবনটাকে এখানেই শেষ করে দেবনা। আমার মেয়ের ভবিষ্যত আমার জীবন আর নেশাখোর স্বামীর হাতে বন্দী থাকতে পারেনা। তাই বাবা মা’কে বলে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেলাম বাবা মায়ের কাছে। বাড়িতে গিয়ে আবার নতুন করে লেখাপড়া শুরু করে দিলাম, কলেজে ভর্তি হয়ে পুরোদমে লেখাপড়া শুরু করলাম।
.
.
অনার্স শেষ করে আমি মাস্টার্সে পড়ছি। সাথে একটি বেসরকারী স্কুলে চাকরী করছি। আমার মেয়েটা পড়ে প্রথম শ্রেণীতে। সে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। প্রায়ই ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করে, সবার বাবা আছে ওর কেন বাবা নাই?
মাস্টার্স শেষ করে একটা একটা সরকারী চাকরীর জন্য আবেদন করব, চাকরীটা হয়ে গেলে আমার আর কোন কষ্ট নেই।
আমার মেয়েটাকে নিয়ে বাকি জীবন পাড়ি দিতে আর সমস্যা হবেনা। বাবা মা অনেকবার বলেছে আমাকে আবার বিয়ে দিবে, আমি রাজী হইনি। আমার মেয়েই আমার সব, ওকে নিয়েই বাকিটা জীবন পড়ি দিতে চাই।
মেয়েটা কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে পাশের বালিশে শুইয়ে দিয়ে নিজেও শোয়ে পড়লাম, সকালে আবার স্কুলে ক্লাস করাতে হবে। জীবন যুদ্ধে আমি এক কঠিন যাত্রী।

✑ কলমে
তসলিমা হাসান
কানাডা

সর্বশেষ সংবাদ