বাঘাইছড়িতে শুরু হতে যাচ্ছে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান

Link Copied!

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় এ মাসেই শুরু হতে যাচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠিন চীবর দান। এই চিবর ধান উৎসবকে ঘিরে পাড়া মহল্লায় শুরু হয়েছে ফানুস( আকাশ প্রদীপ) তৈরির মহা উৎসব। এবার কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার ফানুস বা আকাশ প্রদীপ উড়ানোর লক্ষ নির্ধারন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন মারিশ্যা ইউপি চেয়ারম্যান মানব জ্যাোতি চাকমা।

রঙিন কাগজ জোড়া দিয়ে, বাঁশের রিং ও মোমের সাহায্যে একেকটি ফানুস তৈরির জন্য ব্যায় ধরা হয়েছে দুইশত টাকা। ১০ অক্টোবর রবিবার সকালে উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের তুলাবান নবরত্ন বৌদ্ধ বিহার এলাকায় গিয়ে দেখাযায় তুলাবান এলাকার ১৩ টি পাড়া মহল্লার যুব সমাজ একত্রিত হয়ে ফানুস তৈরির কাজ করছেন। এসময় কথা হয় সামত্রি পাড়া, হেডম্যান পাড়া, সচিমহোন পাড়া, পিত্তি পাড়া, ত্রিপুরা পাড়া ও দার্জিলিং পাড়ার যুবকদের সাথে। তিন থেকে পাঁচ জন মিলে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে মাঠে ফানুস তৈরির কাজ করছে। তাদেরই একজন ধুতি চাকমা জানায় তুলাবান নবরত্ন বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান শুরু হবে ৩০ অক্টোবর চলবে ৩১ অক্টোবর রাত পর্যন্ত, সেই লক্ষ নিয়েই তারা তুলাবান গ্রামের ১৩ টির প্রতিটি পাড়ায় ১০০টি করে মোট ১৩০০ ফানুস তৈরির কাজ করছে। এছাড়াও উপজেলার জীবতলী, তালুগদার পাড়া, আর্যপূর, জীবঙ্গছড়া, খেদারমারা, রুপকারী, সাজেক সহ সব এলাকার বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

কোন ধরনের সরকারি সহায়তা ছাড়াই নিজেদের উত্তলন করা গ্রামবাসীর চাদার টাকাতেই এসব ফানুস তৈরির কাজ করছে তারা। বৌদ্ধদের ধর্মীয় বিশ্বাস এসব ফানুস তাদের পূন্য এনে দিবে এবং নির্বান লাভে সহায়ক হবে। তুলাবান ছাড়াও উপজেলার প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধদের পাড়া-মহল্লায় কঠিন চীবর দান চলবে টানা একমাস তাই এরই মধ্যে উপজেলার সকল বৌদ্ধ বিহারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরুর পাশাপাশি পাড়া মহল্লায় শতশত ফানুস তৈরির কাজ চলছে।

কঠিন চীবর দান, হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মের একটি ধর্মীয় আচার, ও উৎসব, যা সাধারণত বাংলা চন্দ্রপঞ্জিকা অনুযায়ী প্রবারণা পূর্ণিমা (ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা) পালনের এক মাসের মধ্যে যেকোনো সুবিধাজনক সময়ে পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে ত্রি-চীবর নামে বিশেষ পোশাক দান করা হয়। ধর্মাবলম্বীগণ পূণ্যের আশায় প্রতি বছর এভাবে চীবরসহ ভিক্ষুদের অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রীও দান করে থাকেন।

ত্রি-চীবর হলো চার খণ্ডের পরিধেয় বস্ত্র, যাতে রয়েছে দোয়াজিক, অন্তর্বাস, চীবর ও কটিবন্ধনী। এই পোশাক পরতে দেয়া হয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পোশাক বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে দেয়া হয়। এই পোশাক তৈরি করার জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ প্রথমে তুলার বীজ বোনা হয়, পরে তুলা সংগ্রহ করা হয়, তা থেকে সুতা কাটা হয়, সেই সুতায় রং করা হয় গাছ-গাছড়ার ছাল বা ফল থেকে তৈরি রং দিয়ে, এবং সবশেষে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ এক দিনের ভিতর তৈরি করা হয় এই ত্রি-চীবর।

এই পোশাক বোনায় ব্যবহার করা হয় বেইন বা কাপড় বোনার বাঁশে তৈরি ফ্রেম। এরকম বেইনে একসঙ্গে চারজন কাপড় বুনে থাকেন। এভাবে ২৪ ঘণ্টা পর তৈরি হওয়া সেসব পবিত্র চীবর, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে তুলে দেয়া হয় কঠোর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। এভাবে চীবর দেয়া হলে কায়িক-বাচনিক ও মানসিক পরিশ্রম বেশি ফলদায়ক হয় বলে বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এভাবে সাধারণ্যের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি চীবর, বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে দান করার বিষয়টি প্রতিদানহীনভাবে কল্যাণের নিমিত্ত কাজ বৈ আর কিছু নয় এবং এজাতীয় অনুষ্ঠান সমাজে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করবে বলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস। তাছাড়া বুদ্ধের বাণী হলো, কঠিন চীবর দানই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।

বাঘাইছড়ি সদর ইউনিয়ন মারিশ্যা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মানব জ্যাোতি চাকমা বলেন এবার গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে এখনো সরকারি ভাবে কোন সহায়তা পাওয়া যায়নি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন কঠিন চীবর দান বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের একটি পবিত্র অনুষ্ঠান তাদের এই অনুষ্ঠান যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে যাতে পালন করতে পারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।