বিএসএমএমইউতে ৩টি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ

Link Copied!

বিশেষ প্রতিনিধি।।

আগামীকাল ১লা অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ পরিচালিত বাংলাদেশে প্রবীণদের অপুষ্টির কারণসমূহ, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রবীণদের বাত ব্যথার ব্যাপকতা এবং নিরাময় অযোগ্য রোগীদের জন্য হোম বেসড প্যালিয়েটিভ কেয়ার:বাংলাদেশে সম্ভাবনা এই ৩টি গবেষণার ফলাফল আজ বৃহস্পতিবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ইং তারিখে প্রকাশ করেছে।

এ উপলক্ষে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন গবেষণা কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে এবং আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা কর্মকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুরষ্কৃত করা হবে। তিনি অত্যন্ত সময়োপযোগী তিনটি গবেষণা কর্ম সম্পন্ন করার জন্য পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানান।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে সম্মানিত উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ জাহিদ হোসেন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমদ, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম, প্রিভেনটিভ এন্ড স্যোসাল মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক সৈয়দ শরীফুল ইসলাম, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল হান্নান, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবুর রহমান দুলাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান গবেষক ডা. কে এম তৌহিদুর রহমান ও তত্ত্বাবধায়ক গবেষক ডা. মোঃ খালেকুজ্জামান সম্পন্নকৃত গবেষণা বাংলাদেশে প্রবীণদের অপুষ্টির কারণসমূহ এ বলা হয়, সারা বিশ্বেই অনান্যদের তুলনায় প্রবীণদের বয়স মধ্যে অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবীণের সংখ্যা আনুমানিক ১.৫ কোটি।

ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালে সংখ্যাটি ৩.৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ১২৫ জন প্রবীণকে নিয়ে এই গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ প্রবীণ অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং অর্ধেকেরও বেশি পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। পুরুষের (২২ শতাংশ) তুলনায় নারীদের (২৮ দশমিক ৮ শতাংশ) মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি। জীবনসঙ্গীবিহীন (বিধবা, বিপতœীক, অবিবাহিত) প্রবীণদের মাঝে অপুষ্টির হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকির হার ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

প্রবীণদের অপুষ্টির জন্য চিহ্নিত প্রধান কারণসমূহ হচ্ছে-বিষন্নতা, মুখ ও দাঁতের খারাপ স্বাস্থ্য, বিশেষ খাদ্য পরিহারের অভ্যাস এবং অসংক্রামক রোগের উপস্থিতি। বিষন্নতায় ভোগা প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবীণ অপুষ্টিতে ভুগছেন। স্বাভাবিকের তুলনায় বিষন্নতায় ভোগা প্রবীণদের অপুষ্টিতে ভোগার সম্ভাবনা ১৫ দশমিক ৬ গুণ বেশি।

যেসব প্রবীণদের মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য খারাপ, তাদের প্রায় এক তৃতীংাংশ অপুষ্টিতে ভুগছেন। মুখ ও দাঁতের সুস্বাস্থ্য থাকা প্রবীণদের তুলনায় মুখ ও দাঁতের খারাপ স্বাস্থ্যযুক্ত প্রবীণদের অপুষ্টিতে ভোগার সম্ভবনা ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি। মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, এবং ডিম জাতীয় খাবার পরিহার করা প্রবীণদের মধ্যে অপুষ্টি এবং পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি, দুটোই বেশি। স্ট্রোক বা পক্ষাঘাতপ্রস্ত প্রবীণদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি।

এই গবেষণায় সুপারিশসমূহ হলো প্রবীণদের অপুষ্টি দূর করতে পুষ্টি বিষয়ক সুনিদিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা, যেখানে নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রবীণদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে তাদের মানসিক ও মুখের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে জোর দিতে হবে। প্রবীণদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে তাঁদের সঠিক খাদ্যভাস নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান গবেষক ডা. মঈনুল হাসান সম্পাদিত বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রবীণদের বাত-ব্যথার ব্যাপকতা সম্পর্কে বলা হয়, প্রবীণদের জন্য বাত ব্যথা একটি অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবীণদের বেলায় এর ব্যাপকতা বিষয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বাত ব্যথার ব্যাপকতা নির্ণয়ের পাশাপাশি যথোপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামাঞ্চলে বসবাস করা ৩৮০ জন প্রবীণকে নিয়ে এই গবেণাটি করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, ৫২ শতাংশ প্রবীণ বাতÑব্যথার ভুগছেন, যাঁদের অর্ধেকেরও বেশি মাঝারি মাত্রায় শারীরিকভাবে অক্ষম, পুরুষদের (৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ) তুলনায় নারীদের (৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ) মধ্যে সমস্যাটি বেশি পাওয়া গেছে। বাত-ব্যথায় ভোগা প্রবীণদের মধ্যে কোমর ব্যথা (৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ) এবং হাঁটুতে ব্যথার (৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ) সমস্যা বেশি দেখা গেছে। বাত-ব্যথায় ভোগা প্রবীণদের মধ্যে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং ফ্রোজেন শোল্ডারে ভোগার হার হলো যথাক্রমে ৪ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারিয়া হাসিন, পিএইচডি এর গবেষক টিম পরিচালিত নিরাময় অযোগ্য রোগীদের জন্য হোম বেসড প্যালিয়েটিভ কেয়ার: বাংলাদেশে সম্ভাবনা শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, জীবন সীমিত ও নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগী এবং তার পরিবারের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আত্মিক সেবা প্রদানের একটি সার্বিক প্রচেষ্টা ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বা প্রশমন সেবা।

এটি গুরুতর বা নিরাময় অযোগ্য অসুস্থ রোগীদের জন্যে এক ধরণের বিশেষ সেবা। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ নিরাময় অযোগ্য বা দীর্ঘ মেয়াদী নানা রোগে আক্রান্ত রোগীর প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন। ২০০৭ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এর প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ, হোমকেয়ার এবং কমিউনিটি ভিত্তিক তিন ধরণের প্যালিয়েটিভ সেবা দিয়ে আসছে। ২০০৮ থেকে হোম সেইসড প্যালিয়েটিভ সেবা প্রদান করা হয়।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার দল ডাক্তার এবং নার্সদের সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী নিরাময় অযোগ্য রোগীদের বাড়িতে গিয়ে হোম বেইসড প্যালিয়েটিভ সেবা প্রদান করে থাকেন। এই গবেষণাটি মিক্সড মেথড পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হয়েছে ।

১০৪ জন রোগীর মেডিক্যাল রেকর্ড পর্যালোচনা করে এবং ২৪ জন প্যালিয়েটিভ কেয়ার টিমের সদস্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট, চিকিৎসক, নার্স ও রোগীদের সেবা পরিচর্যা কারীদের কাছ থেকে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এটা সম্পন্ন করা হয়।

গবেষাণার ফলাফলে বলা হয়, রোগীদের অর্ধেকেরও বেশির বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ছিল। ৮৭ শতাংশ রোগী মহিলা। ৮৩ শতাংশ রোগী বিবাহিত। ৬৬ শতাংশ রোগী গৃহিনী/গৃহকর্তা। ৫২ শতাংশ রোগীদের জন্য চিকিৎসার খরচ নিজের এবং বন্ধুদের ও পরিবারের সদস্যদের সমন্বয়ে অর্থায়ন করা হয়।

রোগীদের রোগের ধরণ এবং আনুসাঙ্গিক বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ এরও বেশি ক্যান্সার রোগী । ৬২ শতাংশ রোগী ডাক্তার/হাসপাতাল দ্বারা রেফার হয়ে হোম কেয়ারের জন্যে এসেছেন। বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে লিম্ফিডিমা কেয়ার প্রয়োজন হয়। বেশীরভাগ রোগীরই প্রধান লক্ষণ ছিল ব্যথা। রোগীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা ও দুশ্চিন্তার লক্ষণ সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। ১৮ শতাংশ রোগী মনোসামাজিক এবং আধ্যাত্মিক সেবা পেয়েছেন।

সেবার মান ও সেবার বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, সকল সেবা প্রদানকারী প্যালিয়েটিভ কেয়ারের উপর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সামাজিক, মানসিক কিংবা আধ্যত্মিক যতেœর পাশাপাশি শারীরিক বিষয়ের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মীরা সবাই নিজ নিজ কাজের প্রতি খুবই অনুপ্রাণীত। রোগীর পরিচর্যাকারীরা সবাই সেবা ও সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। রোগীর তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক মিটিংকে তারা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভাল বলে উল্লেখ করেছেন।

রোগীর যতœ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্যালিয়েটিভ সেবার অন্যতম শক্তিশালী সহায়ক হচ্ছে প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট (পিসিএ)। সুপারিশে বলা হয়, হোম বেইসড প্যালিয়েটিভ সেবার জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকল প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সেবা সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। সেবাপ্রদানকারীদের জন্যে সঠিক ক্যারিয়ার পরিকল্পনা দরকার। জনসচেতনতা এবং প্রচার প্রয়োজন। মান ও পরিধি বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত মানব সম্পদ এবং উপকরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।