ভাস্কর্যঃ শিশুস্বর্গের সোনার বাংলা

এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার পিপিএম।।

ধরণীতে কেবলই প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিলো যে শিশুটি, সে পলিযুক্ত নরম মাটির মত!
একজন ভাস্কর এর কাছে এমন কাদামাটি এলে তিনি সেটা দিয়ে যেমন পূজনীয় দেবদেবীর মূর্তি বানাতে পারেন, তেমনি পারেন একজন কুখ্যাত শয়তানের মূর্তি বানাতে। নির্ভর করে ওই ভাস্কর কোন দেশের, কোন সমাজের, কোন পরিবার এবং কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি ধরনের শিক্ষা অর্জন করেছেন, কোন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তিনি বাল্যকাল থেকে শিক্ষাকাল কাটিয়েছেন আর কোন ধরনের বন্ধুসঙ্গে তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন তার উপর। এমন কি, কোন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে তিনি বাস্তব জীবনকে উপলব্ধি করেছেন আর সেইসাথে তিনি কোন ধরনের বই-পুস্তক চর্চা করেছেন এমনই সব বিষয়গুলোও তার সৃষ্টিকে প্রভাবিত করে ।

এতকিছুর অবতারণা করেছি এজন্য যে, শৈশব, কৈশোর, যৌবনে যে সকল বিষয় তার মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করেছে সেসব বিষয় গুলোর সমষ্টিযোগে তার চিন্তা-চেতনা ও ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে কর্ম ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সৃষ্টিশীল কাজে সে বিষয়ের ছাপ পড়ে থাকে।অবশ্য, ব্যতিক্রম ও রয়েছে কিছু।সে আলাপে এ আলোচনায় যেতে চাই না। কেননা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষার বাইরে আত্মকর্ষন মূলক উপলব্ধি থেকে অনেক মূর্ত বিমূর্ত ছায়া প্রচ্ছায়ার জন্ম হয়েছে যা সাধারন থেকে ভিন্ন সত্ত্বা লাভ করে কখনো কখনো হয়ে উঠেছে অসাধারণ।

প্রসঙ্গক্রমে সকল ক্ষেত্রে কিংবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাদের জীবনে ভালো সংস্কৃতির দেখা মিলেছে, তারা সঙ্গত কারণেই এই কাদামাটি দিয়ে সুন্দর প্রতিমা বা ভাস্কর্য তৈরি করবেন সেটি স্বাভাবিক। তেমনি করে, সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি এ গ্রহের যে অঞ্চলে, যে বাবা মায়ের কোলে চাঁদের হাসি নিয়ে আসলো তার প্রাথমিক পরিচর্যা শুরু হয় পরিবারেই। পিতা-মাতা, পরিবার যদি সুন্দর হয়, সুশিক্ষিত হয়, ভাল মানুষ হয়, তবেই শিশুটির জীবন যাত্রা শুরু হয় ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠার লক্ষ্যে।

অন্যথায় সমাজ কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট পরিমিতি করে যদি তার জীবন গঠনের কোন পরিষ্কার কাঠামো তৈরি করা যায় এবং সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বাবস্থায় তাদের একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে মা-বাবার পাশাপাশি সমাজ রাষ্ট্র অনেক বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে একজন সুনাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে। কাজেই শিশুটি কোথায় জন্ম নিল সেটিও বিবেচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। ফিনল্যান্ডে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত একজন শিশু-কিশোরকে কোনো রকম পরীক্ষা পদ্ধতির মুখোমুখি হতে হয় না। এতটা সময়ের মধ্যে একজন শিশুর চিন্তার জগত কেমন তা শিক্ষকরা নির্ধারণ করে ফেলেন খুব চমৎকার ভাবে। অতঃপর তাদের প্রত্যেকের স্বপ্নমতে বিশেষায়িত শিক্ষা জীবনের দিকে পরিচালনা করা হয়।

জেনে রাখা প্রয়োজন, সেদেশে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে যারা একেবারেই প্রথম সারির, তাদের মধ্যে থেকে সেরাদের বেছে নিয়ে উচ্চ বেতনে পুরো এক বছর প্রশিক্ষন করিয়ে অতঃপর তাদের মধ্য থেকে সেরাদের বেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় চুড়ান্তভাবে। একবার ভেবে দেখুন তো, সেদেশের সন্তানেরা সুসন্তান কিংবা সুনাগরিক হবে না কেন?

আমাদের দেশের চিত্র পুরোটাই তার উল্টো। আর ঐ সকল দেশে অপরাধ প্রবণতা এতই কম যে, জেল সিস্টেম সেখানে কার্যকরী নয় বললেই চলে। সেখানে আমাদের চিত্রটা কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ একটাই,প্রায় সবকিছুতেই বিপরীত পথে চর্চা করছি আমরা জেনে শুনে। কাজেই, আমাদের শিশু-কিশোররা যাদের হাত ধরে যে পরিবেশে যে শিক্ষা পাচ্ছে, যাদের দ্বারা শিক্ষা পাচ্ছে বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে আর যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বেড়ে উঠছে, তাতে সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয় রোধ করা প্রায় অসম্ভব।

জন্মকালে সাত কোটি মানুষের দেশে এখন ষোল সতেরো কোটি মানুষের বাস।তখনও মন্দ লোকের সংখ্যা কম ছিলনা, তবে ভালো মানুষের সংখ্যা যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল তাতেও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বর্ধিত জনসংখ্যার বেশিরভাগই যে মন্দ কাতারে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, পরবর্তীতে তা বলতে গবেষণার প্রয়োজন নেই মনে করি। বরং গাণিতিক হারে ভালো মানুষের সংখ্যা যেমন কমে গেছে,তেমনি জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে মন্দ মানুষের সংখ্যা।

ফলে বিভিন্ন সূচকে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও, চরম অবনতি হয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়নে তথা সুনাগরিক তৈরীর ক্ষেত্রে। অথচ, সুন্দর প্রাপ্তির প্রত্যাশা পূরণে এটিই পূর্বশর্ত। তুমি সব কিছুতেই সুন্দর খুঁজে পেতে পারো কেবল যদি তুমি সুন্দর মানুষ গড়ে তুলতে পারো। আর এ সুন্দর মানুষ তৈরীর ক্ষেত্রে পঞ্চাশ বছরের এদেশে আমরা কোন ভাবেই সফল নই। সেই সাথে আমাদের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটিও এমন প্রত্যাশিত সুন্দর কে প্রকাশ করেনা।

শিক্ষাব্যবস্থার দূবর্লতা আজ প্রকট। শহর ও গ্রামের পরিকাঠামোগত পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। যারা শিক্ষকতা পেশায় আসেন, তাদের সঠিক প্রশিক্ষনের অভাবও দৃশ্যমান। সরকারিভাবে যে সকল প্রকল্প এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা দিয়ে কতটুকুই বা সম্ভব সুনাগরিক গড়ে তোলা, সেটিও ভাবা দরকার। মনে রাখা দরকার বেসিক ইনপুট সুন্দর না হলে আউটপুট সুন্দর প্রত্যাশার কোনই কারণ থাকতে পারেনা। তদুপরি,মেধা বিকাশের সহায়ক খেলাধুলার মাঠ, নদী-নালা, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য যেভাবে নগরায়নের নামে,শিল্প-কারখানা তৈরীর বাহানায় ধ্বংশ করা হচ্ছে,তাতে অবারিত শিশুজগত আজ বাধ্য হয়েই গৃহবন্দী।

যাদের জন্য এত বাহ্যিক উন্নয়নে আমরা মহাব্যস্ত, তাদেরকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা ততটাই উদাসীন। বর্তমানে গড়ে ওঠা খাদ্যভ্যাস থেকে শুরু করে সবকিছুই আজ শিশুদের মনোবিকাশ এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সর্বনাশ করছে। এমনকি, অল্প বয়সী শিশুদের কাঁধে চেপেছে এতটা ভারী ব্যাগ যে, তা তার নিজের ওজনের চেয়েও বেশি। আর অসম্ভব প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষাভীতির কারনে অনেক অভিভাবক নকল নীতি বা টাকা পয়সা খরচ করে ভর্তি, কোচিং ইত্যাদি নানা চাপ সৃষ্টি করে অঙ্কুরেই সন্তানের শৈশব ধ্বংস করছে। কাজেই, এ শিশু বড় হয়ে দেবতা হবার কোন সম্ভাবনা নেই তা সহজে অনুমেয়। বিপরীতে