অনন্য অসাধারণ বঙ্গমাতা

- Advertisement -

লেখক: মো: কামাল হোসেন, তথ্য অফিসার

জাতীয় জীবনে আগস্ট এক বেদনা বিধুর মাস। শোকে কাতর বাঙ্গালি জাতির জাতীয় শোক দিবস এ মাসে। ১৯৭৫ সালের এ মাসেই বাঙালি জাতি হারিয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বেদনার এ মাসে বঙ্গবন্ধু-পত্নীর জন্মদিন ৮ আগস্ট এবং জেষ্ঠ্য পূত্র শেখ কামালের জন্মদিন ৫ আগস্ট। শোকের মাসেও তাই এদেশের মানুষ চোখের শোকাশ্রু মুছে এক মহীয়সী নারীর ত্যাগ ও দুঃখবরণ এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়।
২০১৭ সালে ৮ আগস্ট হতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জন্মদিন জাতীয়ভাবে পালনের সুপারিশ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের পর বঙ্গমাতার জন্মদিন জাতীয় ভাবে পালন হয়ে আসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য সহধর্মিণী ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মদিবস ডিজিটাল পদ্ধতিতে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্মদিনও উদযাপন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবছর। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ৫ আগস্ট সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়।
১৯৩০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তার বাবার নাম শেখ জহুরুল হক এবং মায়ের নাম হোসনে আরা বেগম। একভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। শৈশবে বাবা-মাকে হারানোর পর শেখ ফজিলাতুন নেছা বেড়ে ওঠেন দাদা শেখ কাশেমের কাছে। সম্পর্কে তিনি জাতির পিতার আত্মীয় হতেন। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার। শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর-ননদের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠার পেছনে মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অনন্য সাধারণ ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে পর্দার অন্তরালে থেকে তিনি পরামর্শ, সাহস, অনুপ্রেরণা ও সকল কাজে সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। বঙ্গমাতার অবদান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “রেনু খুব কষ্ট করত, কিন্তু কিছুই বলতো না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত। যাতে আমার কষ্ট না হয়।”(সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান; পৃষ্ঠা নং ১২৬)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ প্রেক্ষাপটে নেপথ্যে থেকে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী হয়ে তাঁর প্রতিটি কাজে প্রেরণার উৎস হয়েছেন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতার সঙ্গে বুলেটের নির্মম আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে।
বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিবকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। দেশের জন্য রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবারের জন্য বিশেষ করে নিজের স্ত্রীকে যথেষ্ঠ সময় তিনি দিতে পারেন নি। স্ত্রীর প্রতি জাতির পিতার ভালোবাসার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই তার লেখায়। তিনি লিখেছেন,“রেণু তো নিশ্চয় পথ চেয়ে বসে আছে। সে তো নিরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু বলে না বা বলতে চায় না, সেই জন্য আমার আরও বেশি ব্যথা লাগে।”(সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান; পৃষ্ঠা নং ১৪৬)
বঙ্গবন্ধুর প্রতি বেগম মুজিবের গভীর ভালোবাসার কথাও উঠে এসেছে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায়। বিদায় দেওয়ার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,“ রেণু আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় নিরবে চোখের পানি ফেলছিল। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম না,একটা চুমো দিয়ে বিদায় নিলাম। বলবারতো কিছুই আমার ছিলো না, সবই তো ওকে বলেছি।”(সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান; পৃষ্ঠা নং ১৬৪)
বঙ্গবন্ধু বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ভেঙে পড়েননি বেগম মুজিব। সব সময় জাতির পিতাকে সাহস যুগিয়েছেন, পরিবারের সদস্য ও দলের নেতাকর্মীদের আশ্রয়স্থল ছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব।
বিভিন্ন হামলা-মামলা, বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়ে বেগম মুজিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। শেখ মুজিব যখন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নেতাদের সঙ্গে বসতেন, বেগম মুজিব সবসময় খেয়াল রাখতেন কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে। তিনি সময়মতো তার মতামত দিতেন কিন্তু কখনো তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতেন না। তিনি তার বার্তাটি পৌঁছে দিতেন। মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,‘‘অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মায়ের দৃঢ় ভূমিকা।’’
বঙ্গবন্ধু জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন সবটাতেই বঙ্গমাতা তাঁকে ছাঁয়ার মত সাহায্য করেছেন। তাঁর উৎসাহে বঙ্গবন্ধু কারাগারে আত্মজীবনী লিখেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’। জাতির পিতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা ইতিহাসের সম্ভার এ গ্রন্থ দু’টি। (বঙ্গবন্ধুর লেখা তৃতীয় বইয়ের নাম ‘আমার দেখা নয়াচীন’)। এই আত্মজীবনী সংরক্ষণে বঙ্গমাতার ভূমিকা ইতিহাস নিশ্চয়ই মনে রাখবে। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, তুমি তোমার মনের কথাই সে সময়ে বলবে। তোমার স্বপ্নের কথা বলবে।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর মনের কথাগুলো বলেছিলেন বলে আজ এটি শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় শ্রেষ্ঠতম স্থানে পৌঁছেছে। ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ তালিকাভূক্ত করা হয়েছে।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরু। তারপর একরকম বন্দীজীবন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি বিলাসী জীবনে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু নিজের গড়া ৩২ নম্বরের বাড়িতেই থেকে যান। সারা জীবন ছায়ার মতো স্বামীর পাশেই ছিলেন। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি বলেছিলেন, ‘ওনাকে যখন মেরে ফেলেছো আমাকেও মেরে ফেল’। প্রচারবিমুখ মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। পর্দার অন্তরালে থেকে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়েছেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে ছায়ার মতো থেকে শক্তি জুগিয়েছেন। একটি স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। জাতির পিতার দীর্ঘ সংগ্রামে অনন্য ভূমিকার জন্য তিনি ক্রমেই হয়ে উঠেছেন রেণু থেকে বঙ্গমাতা।
এই মহীয়সী নারীর জীবন পরম গৌরবের। একদিকে তিনি জাতির পিতার পত্নী, শহীদ সন্তানদের জননী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনারও জন্মদাত্রী। তরুণ প্রজন্মের কাছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জীবন সংগ্রাম, শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবাসকালে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংগঠিত করা এবং তার দেশপ্রেমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আরও বেশি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ৯০ তম জন্মদিবসে মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা।

তথ্য সূত্র:
অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান
কারাগারের রোজনামচা-শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলাপিডিয়া
লেখক: মো: কামাল হোসেন
তথ্য অফিসার,

adprkamal@gmail.com

০১৮৩১১১৭৭৭৭

- Advertisement -

সর্বশেষ খবর

ভোলায় কিস্তির টাকার জন্য জামিন দাতার বাড়িতে এনজিও কর্মীর চড়াও

মোঃ সিরাজুল ইসলাম। ভোলা জেলা প্রতিনিধি।। ভোলায় করোনা কালীন সময়ে ঋনের কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য জামিনদাতার বাড়িতে এক এনজিও (গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা...
- Advertisement -

মিয়ানমারে সমরসজ্জায় সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে

মো.শহীদ। উখিয়া প্রতিনিধি।। বিপি ৪৫ এ সালিডং বর্ডার ক্যাম্পের কাছাকাছি মিয়ানমারের সেনা ক্যাম্প মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক সমরসজ্জার কারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাখাইন...

আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর উদ্বোধন

সাইফ জাহান। চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি।। আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। বেলগাছি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এস এম গোলাম সরোয়ার শামীম এর উদ্যোগে...

রিলেটেড নিউজ

ভোলায় কিস্তির টাকার জন্য জামিন দাতার বাড়িতে এনজিও কর্মীর চড়াও

মোঃ সিরাজুল ইসলাম। ভোলা জেলা প্রতিনিধি।। ভোলায় করোনা কালীন সময়ে ঋনের কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য জামিনদাতার বাড়িতে এক এনজিও (গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা...

মিয়ানমারে সমরসজ্জায় সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে

মো.শহীদ। উখিয়া প্রতিনিধি।। বিপি ৪৫ এ সালিডং বর্ডার ক্যাম্পের কাছাকাছি মিয়ানমারের সেনা ক্যাম্প মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক সমরসজ্জার কারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাখাইন...

আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর উদ্বোধন

সাইফ জাহান। চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি।। আলমডাঙ্গার ফরিদপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। বেলগাছি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এস এম গোলাম সরোয়ার শামীম এর উদ্যোগে...
- Advertisement -