সর্বনাশা চাকরির ফাঁদে ৩ নারী, আটক ৫

মেহেদী হাসান

ঢাকার বাসিন্দা শারিকা (ছদ্মনাম), করোনার প্রাদুর্ভাবে সংসার চালানো দায়, তাই বিভিন্ন যায়গায় খুজছেন চাকরি। পরিচিত এক নারী তাকে ক্লিনিকে চাকরি দেয়ার কথা বলে গতকাল সকালে নিয়ে আসে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহিদ ফারুক সড়কে একটি ভবনের ৫ম তলায়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান বিভিন্ন কক্ষ। তাকে বিশ্রামের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় একটি রুমে। সেখানে বিছানাসহ সব কিছুই রয়েছে। তবে সেখানে বিভিন্ন নারী ও পুরুষদের আনাগোনায় আর শারিকার বুঝতে দেড়ি হয়নি যে কোথায় এসেছে সে। এরপর কি ঘটেছে তার সাথে তা শারিকা মুখে বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। গতকাল শুক্রবার মানবাধিকার সংস্থা “এইচআরএইচএফ” এর দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে পুলিশ যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার সৈকত নামের আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ৩নারীকে উদ্ধার করে। এরা সকলেই নারীপাচারকারীদের জিম্মি ছিল। তবে এর সাথে জড়িত থাকা একাধিক খদ্দের ও নারীপাচারকারীদের ঘটনাস্থল থেকেই গোপন উৎকোচের মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ারও অভিযোগ ওঠে। সেখানে দুপুর আনুমানিক ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত চলে পুলিশের নাটকিয় অভিযান। ঘটনাস্থল থেকেই দেহ ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত আবাসিক হোটেলের একজন মালিক সাইদুর ও খদ্দের ন্যাশন্যাল ব্যংকের অফিসার আবদুল মোক্তাদিরসহ প্রায় ১০জন অপরাধিকে ছেড়ে দিয়ে ৩জন নারী ও ৪জন নারীব্যবসায়িকে আটক করে নিয়ে যায় যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক আতোয়ার ও তার সঙ্গিয়রা। বাংলাদেশের আলোর এক গোপন ভিডিওতে দেখা গেছে, থানা পুলিশের অভিযান চলাকালীন সময় নারী ব্যবসার কাজে হোটেলটিতে অবস্থান করছিল প্রায় ২০-২৫জনের মত লোক। আর পুলিশ পাহারায়ই হোটেলের এক গোপন মালিক (পার্টনার) ও একটি ব্যংকের অফিসারকে (খদ্দের) নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। অভিযান চলাকালীন সময়ে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে এসআই আতোয়ার সাংবাদিকদের দূরে রেখে গোপন আতাতের মাধ্যমে প্রায় ৪-৫জন পুরুষ ও উদ্ধার হওয়া ৩জন নারীকে থানায় নিয়ে যায়।
এবিষয়ে মুঠোফোনে যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আতোয়ারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশের আলোকে জানান, হোটেলটি অভিযান চালিয়ে ৩জন নারী ও ৫জন পুরুষ নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি তাদের আনা হয়নি। এদিকে হোটেলের একটি খাতায় দেখা যায় ৩৮জন হোটেল স্টাফের তালিকা।
এবিষয়ে ঘটনাস্থলে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শি বাংলাদেশের আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার এই হোটেলটি মিলাদ পরিয়ে উদ্ভোদন করা হয়েছে। আর শুক্রবার থেকেই নারী ব্যবসা শুরু হয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এটা সত্য তবে সেখানে বহু লোক ছিল। কিন্তু পুলিশ হোটেলটি থেকে ৩জন নারী ও ৫জন পুরুষ নিয়ে গেছে।
অভিযানে ছেড়ে দেয়া যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকার বাসিন্দা জাকির বাংলাদেশের আলোকে বলেন, একটি ব্যবসায়িক কাজে ন্যশন্যাল ব্যাংকের এক অফিসারের সাথে তিনি বৈঠক করতে সেখানে সকালে গিয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন সেখানে নারীঘটিত কার্যকলাপ হয়। পুলিশ তাদের সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। তাদের কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেয়া হয়নি।
জানা গেছে, হোটেলটিতে বৃহস্পতিবার মিলাদের পরই খদ্দেরদের দর উঠতো জিম্মি থাকা নারীদের বয়স অনুযায়ী। যার বয়স যত কম তার রেট তত বেশি। আর যদি কোন নারী এই কাজে রাজি না হত তাহলে তাদের হতে হত নানাবিধ নির্যাতনের শিকার। হোটেলের মালিক সাইদুল প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ তেমন কেউ মুখ খোলেনা। যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিভিন্ন ফ্ল্যাট বাসা ভারা নিয়ে সেখানে নারীদের জিম্মি করে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করাতো সাইদুল।
বিশ্বস্ত সুত্র জানায়, নারীপাচারকারী সাইদুল সিন্ডিকেট রাজধানী থেকে প্রেম, বিয়ে ও লোভনীয় চাকরির প্রলোভনে নারীদের সংগ্রহ করে এনে প্রথমে নিজেরা ধর্ষণ করে ভিডিও ফুটেজ ধারন। পরে তাদের তাদের জিম্মি করে বাধ্য করে দেহ প্রসারনি হতে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এদিকে সাইদুল সিন্ডিকেট যাত্রাবাড়ীর সায়দাবাদ এলাকায় বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ জনি ম্যানেজ করে চালাচ্ছে নারী ব্যবসা।